মৃত্যুর আগে জীবনের উদযাপন: এক মানুষের বিরল চল্লিশা আয়োজন

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে চল্লিশা বা মৃত্যুপরবর্তী ভোজ এক সুপরিচিত প্রথা। কিন্তু যদি কেউ নিজের চল্লিশার আয়োজন নিজেই করেন, মারা যাওয়ার বহু আগেই, তাহলে কেমন হবে? সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় এমনই এক অভূতপূর্ব ঘটনা জন্ম দিয়েছে দারুণ কৌতূহলের। রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি জীবিত অবস্থায়ই প্রায় ছয় হাজার মানুষকে খাইয়েছেন, যা তার নিজ চল্লিশার আয়োজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই ঘটনা কেবল স্থানীয়দের নয়, গোটা অঞ্চলের মানুষের মনেই বিস্ময় ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাধারণত চল্লিশা অনুষ্ঠিত হয় মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায়, তার মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং পরিচিতজনদের আপ্যায়ন করা হয় মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে। কিন্তু রফিকুল ইসলামের এই আয়োজন সেই চিরাচরিত প্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি কি চেয়েছেন নিজের জীবদ্দশায়ই দেখে যেতে তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা? নাকি মৃত্যুর পরবর্তী ভোজের ভার পরিবারের ওপর না চাপিয়ে নিজেই তা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।

এমন ঘটনা সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ এটাকে একটি মহৎ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের জীবদ্দশাতেই সমাজ ও মানুষকে কিছু দিতে পেরেছেন। আবার কেউ কেউ এর মধ্যে কিছুটা eccentricity বা উদ্ভটত্ব খুঁজে পাচ্ছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আয়োজন প্রমাণ করে যে মানুষের জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা ভিন্ন হতে পারে। নিজের বেঁচে থাকতেই মানুষের জন্য কিছু করার এবং সেই আনন্দ উপভোগ করার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রফিকুল ইসলাম।

এই ঘটনা কেবল একটি সামাজিক ভোজ নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও অনেক গভীর অর্থ। এটি কি জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের প্রতি এক সচেতন বার্তা? নাকি মানুষকে ভালোবাসার এক আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ, যা সাধারণত মৃত্যুর পরেই করা হয়? আমরা অনেকেই জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর জন্য কিছু কাজ ফেলে রাখি, কিন্তু রফিকুল ইসলাম যেন সেই ধারণাটিকে উল্টে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নিজের শেষ ইচ্ছে পূরণ করার জন্য মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই; বরং জীবিত অবস্থায় সেই কাজগুলো সম্পন্ন করার আনন্দই অন্যরকম। এটি একপ্রকার মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তির ইঙ্গিতও বহন করে।

সব মিলিয়ে রফিকুল ইসলামের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সমাজের চিরাচরিত রীতিনীতিকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। জীবনের অনিশ্চয়তা আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক চমৎকার মিশেল এই ঘটনা। তিনি হয়তো নিজের মতো করে জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়কে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, যেখানে তিনি তার নিজের হাতে, নিজের ইচ্ছায় অসংখ্য মানুষকে আপ্যায়ন করেছেন। এই বিরল আয়োজন ভবিষ্যতের জন্য একটি চিন্তা উদ্রেককারী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকেই কীভাবে অর্থবহ করে তোলা যায়।

উৎস: https://www.prothomalo.com/video/bangladesh/bjriyeb8ka

সর্বশেষ লেখা